বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর ২০২০

কার্তিক ৭ ১৪২৭

ই-পেপার
দৈনিক আমার সংবাদ :: Daily Amar Sangbad বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর ২০২০ | কার্তিক ৭ ১৪২৭

কাগজেই সীমাবদ্ধ সংক্রামক ব্যাধি আইন!

Writter

শরিফ রুবেল

১৮:৪৬, ৩ মে ২০২০   আপডেটঃ ১২:৩৭, ২৩ জুন ২০২০

কাগজেই সীমাবদ্ধ সংক্রামক ব্যাধি আইন!

  *সাজার নজির নেই সংক্রামক আইনে *অধিকাংশ মানুষ আইন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল *করোনা গোপন করলে ৬ মাসের জেল জরিমানা *করোনাকে সংক্রামক ব্যাধির তালিকাভুক্ত*আইনটি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লে কমবে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি মত বিশেষজ্ঞদের *প্রয়োগ না থাকলে আইন থাকা, না থাকার সামান মত আইনজীবীদের মোস্তাকিম

  *সাজার নজির নেই সংক্রামক আইনে *অধিকাংশ মানুষ আইন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল *করোনা গোপন করলে ৬ মাসের জেল জরিমানা *করোনাকে সংক্রামক ব্যাধির তালিকাভুক্ত*আইনটি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লে কমবে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি মত বিশেষজ্ঞদের *প্রয়োগ না থাকলে আইন থাকা, না থাকার সামান মত আইনজীবীদের মোস্তাকিম বিল্লাহ (ছদ্মনাম)। বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নে।কাজ করেন ঢাকার ফার্মগেট এলাকার একটি ঔষুধ কোম্পানিতে। গত ২৬ এপ্রিল শরীরে সর্দি, জ্বর ও কাশি দেখা দেয়। ২৮ এপ্রিল নিজেই করোনা সন্দেহে নমুনা পরীক্ষা করান। রিপোর্টে করোনা পজোটিভ আসে। বিপত্তি ঘটে এখানেই। করোনা সনাক্ত হওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে ৩০ এপ্রিল রাতে পালিয়ে রাজশাহী ফেরেন তিনি। শুধু এখানেই শেষ নয়। করোনা সক্রামন গোপন করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভর্তি হন হাসপাতালেও। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার শরীরে করোনা উপসর্গ দেখতে পেয়ে তাকে খ্রীষ্টিয়ান মিশন হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য স্থাপিত আইসোলেশন ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেন। পরবর্তিতে মুস্তাকিম করোনা পজেটিভ সেটা স্বীকারও করেছে। শুধু মুস্তাকিমই নয় সারাদেশে বেশকিছু ব্যাক্তি করোনা ভাইরাসের তথ্য গোপন করে অবাদে চলছে জনসমুক্ষে ঘুরে বেড়ানোর খরব বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। করোনা নিয়ে পালিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে চলে যাওয়ার মত ঘটনাও ঘটে চলেছে। এমনকি প্রয়োজন ছাড়া চলছে যত্রতত্র ঘোরাফেরা। মহামারি করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকার ঘোষিত কোন পদক্ষেপই মানছেনা সাধারণ জণগন। অধিকাংশই লকডাউন, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন ও সামাজিক নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা মানছে না। অনেক সময় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠছে কিছু কিছু চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এছাড়া করোনার লক্ষণ থাকলেও তা গোপন করে চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন অনেকেই। আবার কেউ কেউ প্রতিবেশীর কাছেও করোনার লক্ষণ গোপন করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। লকডাউনের মধ্যেও ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে চলে যাচ্ছেন বাড়িতে। ফলে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাও। এ অবস্থায় ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন-২০১৮’-এর কঠোর প্রয়োগ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মূলত যেকোন সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে মানুষ যেন নিজে বাঁচার পাশাপাশি অন্যকে সংক্রমিত না করতে পারে সে লক্ষ্যে আইনটি করা হয়। জনস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবিলা ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি হ্রাসকরণের লক্ষ্যে দেশে এটি একটি উপযুক্ত আইন। সংক্রামক ব্যাধিতে মানুষ যেন নিজে বাঁচার পাশাপাশি অন্যকে সংক্রমিত না করতে পারে সে লক্ষ্যে আইনটি করা হয়। এই আইন অমান্য করলে শাস্তির বিধানও অত্যন্ত সুস্পষ্ট। সমস্যা হলো আইনটি সম্পর্কে জানে না অনেকেই। অধিকাংশ মানুষই এই আইন সম্পর্কে তেমন ওয়াকিবহাল। মানার বিষয়েও তাদের কোনো আগ্রহ নেই। এদিকে সংক্রামন রোগ গোপন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও কাউকে এই আইনের আওতায় এনে সাজা দেয়ার নজির নেই। এখনো বাস্তবায়ন নেই সক্রমক ব্যাধি আইনের। ফলে দিনদিন বাড়ছে উক্ত আইন অমান্যকারীর সংখ্যাও। আবার সঠিক প্রচারণার অভাবে অনেকেরই ধারণা নেই সংক্রমক ব্যাধি আইন সম্পর্কেও। ফলে কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে আইনটি। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, আগে জানবে তারপরে মানবে। মানুষ সংক্রামক আইন সম্পর্কে জানে না । অধিকাংশ মানুষই এই আইন সম্পর্কে তেমন ওয়াকিবহাল না হওয়ায় মানার বিষয়েও তেমন কোন গুরুত্ব নেই। আর এখনো সংক্রামক আইনে কাউকে সাজা দেয়ারও নজির নেই। তাই এমন আইন থাকা না থাকা একই। যদি এই আইনের ওপর সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায় তবে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এজন্য মানুষ যেন আইনটি সম্পর্কে জানতে পারে সে বিষয়ে আগে প্রচার প্রচারনা ও সচেতনতা তৈরি করা জরুরি বলে অভিমত তাদের। জানা গেছে, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল আইন ২০১৮’র ক্ষমতাবলে সারাদেশকে সংক্রামণ ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে।করোনাভাইরাসকেও সংক্রামক ব্যাধির তালিকাভুক্ত করেছে সরকার। এ আইন লঙ্ঘন করলে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেয়ার বিধান রয়েছে। তারপরেও আইন অমান্য করে যাচ্ছেন বেশির ভাগ মানুষ। ভিড় লেগে আছে হাট-বাজার, চায়ের দোকানসহ প্রায় জায়গাতেই। সংক্রামক আইন কতোটা কার্যকর হচ্ছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ আমার সংবাদকে বলেন, প্রথমত সংক্রামক ব্যাধি আইনটি কার্যকর হয়না মূলত প্রয়োগকারীদের অজ্ঞতার কারনে। আবার অধিকাংশ মানুষই জানেনা এমন একটি শাস্তিযোগ্য আইন আছে। এমনকি যারা আইনটি প্রয়োগ করবে যেমন প্রশাসন তাদেরও অনেকে এটা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। সেজন্যই এর কোন কার্যকারিতা নেই। এমনকি শাস্তিরও নজির নেই। শুধু সংক্রামক আইন নয় আমাদের দেশে ভাল কাজের জন্য অনেক আইন আছে যেটা সাধারন মানুষ জানে না। তবে যেহেতু কোর্ট কাচারি বন্ধ রয়েছে তাই এই আইনটির বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং শাস্তির বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারলে সংক্রমনের বিস্তার কিছুটা কমবে। আসলে এখন সব বিষয়েই একটা সমন্বয়নহীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে যেটার জন্য করোনা মত প্রাণঘাতি রোগ নিয়ন্ত্রন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্টদের আরো উদ্যেগী ভূমিকা পালন করতে হবে। তবেই করোনার মোকাবেলা করা সম্ভব। এ বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের আরেক আরেক আইনজীবী মেহেদী হাসান চৌধুরী বলেন, সংক্রামক আইনটি নতুন তাই প্রথমে আইনটি সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। সচেতনতা না থাকলে সংক্রমক রোগ নির্মূল করা অসম্ভব। সরকার চাইলে এ আইনের কঠোর প্রয়োগ করে করোনার বিস্তার ঠেকাতে পারে। কিন্তু এখনো আইনটির যথার্থ প্রয়োগ দেখা যায়নি। কোনো এলাকায় মহামারি সংক্রমণের রোগী থাকলে ঐ এলাকার চিকিৎসক তাঁকে চিকিৎসা সেবা দিতে বাধ্য এবং সেই সাথে ওই জেলার সিভিল সার্জেনকে বিষয়টি অবহিত করবেন। সরকার সেই এলাকায় লকডাউন সহ যেকোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। এ বিষয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, আইন থাকা সত্ত্বেও মানুষ সেটা মানছেনা। এই আইনের অধীনে দু`এক জনকে সাজা দিলেই সবাই ভয় পাবে। সিভিল সার্জেনের কাছে যদি মহামারি আক্রান্ত এমন কোনো তথ্য আসে তবে তিনি সাথে সাথে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানাবেন। মহাপরিচালক তখন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।দেশের সাধারণ জনগণ নতুন সংক্রামক আইনটি সম্পর্কে একেবারেই অনভিজ্ঞ। কারণ, এ ধরনের ভয়ঙ্কর জীবাণুবাহী ছোঁয়াচে রোগ একেবারেই নতুন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের আগে ম্যালেরিয়া, কলেরা, ফাইলেরিয়াসিস, ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, এভিয়ান ফ্লু, নিপাহ ভাইরাস, অ্যানথ্রাক্স, মার্স-কভ, জাপানিস এনকেফালাইটিস, ডায়রিয়া, যক্ষ্মা, শ্বাসনালীর সংক্রমণ, এইচআইভি, এইডস, ভাইরাল হেপাটাইটিস, মেনিনজাইটিস, ইবোলা ভাইরাস, জিকা, চিকুনগুনিয়া, প্লেগ প্রভৃতি সংক্রামক ব্যাধির নাম শুনলেও করোনাভাইরাস সম্পূর্ণ নতুন, যার কোনো ভ্যাকসিন বা টিকা আবিষ্কার হয়নি। ফলে সরকার আইনটির ৪(ভ) ধারার বিধান মতে, নতুন জীবাণুবাহী ব্যাধি নভেল করোনাভাইরাসকে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে সংক্রামক ব্যাধি ঘোষণা করেছে। সংক্রামক রোগপ্রতিরোধ আইনে বিচার ও শাস্তি কি:২০১৮ সালের ওই আইনের ‘সংক্রামক রোগের বিস্তার এবং তথ্য গোপনের অপরাধ ও দণ্ড’ শীর্ষক ২৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘২৪। (১) যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক জীবাণুর বিস্তার ঘটান বা বিস্তার ঘটিতে সহায়তা করেন, বা জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও অপর কোনো ব্যক্তি সংক্রমিত ব্যক্তি বা স্থাপনার সংস্পর্শে আসিবার সময় সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি তাহার নিকট গোপন করেন তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।’ (২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনূর্ধ্ব ৬ (ছয়) মাস কারাদন্ড বা অনূর্ধ্ব ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন। ‘দায়িত্ব পালনে বাধা প্রদান ও নির্দেশ পালনে অসম্মতি জ্ঞাপনের অপরাধ ও দন্ড শীর্ষক ২৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘২৫ (১) যদি কোনো ব্যক্তি(ক) মহাপরিচালক, সিভিল সার্জন বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তাহার ওপর অর্পিত কোনো দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বাধা প্রদান বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন, এবং (খ) সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের উদ্দেশ্যে মহাপরিচালক, সিভিল সার্জন বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কোনো নির্দেশ পালনে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ। (২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনূর্ধ্ব ৩ (তিন) মাস কারাদন্ড বা অনূর্ধ্ব ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন। মিথ্যা বা ভুল তথ্য প্রদানের অপরাধ ও দণ্ড শীর্ষক ২৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘২৬ (১) যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা ভুল তথ্য প্রদান করেন তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ। (২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনূর্ধ্ব ২ (দুই) মাস কারাদন্ড বা অনূর্ধ্ব ২৫ (পঁচিশ) হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। ফৌজদারি কার্যবিধিতে উল্লেখিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এ আইনের অধীনে করা অপরাধের বিচার হবে বলেও আইনে উল্লেখ রয়েছে। আমারসংবাদ/এসআর/এআই ##!!##

আমার সংবাদ

Lifebouy
ads
Lifebouy
Capture
Capture